August 14, 2026, 5:28 pm

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন পোর্টাল
সংবাদ শিরোনাম :
দুই কোটি টাকার নকল সিগারেট জব্দ, বিএটির এজাহারে ৩ লাখ, জব্দ তালিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন ভুয়া কাবিন-তালাকনামার অভিযোগে কুষ্টিয়ায় মামলা, তদন্তে পুলিশ দর্শনা সীমান্ত দিয়ে আসছে ভারতের ১৯ নতুন প্রজন্মের রেল কোচ শতাব্দীর প্রথম পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, খুলে গেল সূর্যের রহস্যের জানালা, বাংলাদেশ কেন বঞ্চিত হলো কুষ্টিয়ায় জুলাই স্মৃতিস্তম্ভে আগুন, তদন্ত কমিটি গঠন ইবির একাডেমিক ও প্রশাসনিক সেবা ডিজিটালাইজেশনে উপাচার্যের উদ্যোগ, গঠন ৭ সদস্যের কমিটি দীর্ঘদিন পর নতুন কমিটি/ কুষ্টিয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদার মেহেরপুরে রাস্তা মেরামতে মিলল ৯৬ মাইন, সেনাবাহিনীর হাতে নিষ্ক্রিয় কুষ্টিয়ায় এসএসসি ২০২৬: জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে কুষ্টিয়া সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এসএসসি ও সমমানে পাসের হার কমে ৬২.২৫%, ফেল ৬ লাখ ৯০ হাজার

দক্ষ শিক্ষক সংকটে বাংলাদেশ/ দক্ষিণ এশিয়ার নিচের সারিতে অবস্থান ও নীতিগত প্রশ্ন

ড. আমানুর আমানের কলাম/
দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থার তুলনামূলক চিত্রে বাংলাদেশ আবারও একটি উদ্বেগজনক অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। ইউনেস্কো প্রকাশিত সর্বশেষ বিশ্ব শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ন্যূনতম দক্ষতাসম্পন্ন শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে। মাধ্যমিক স্তরে মাত্র ৫৫ শতাংশ শিক্ষক নির্ধারিত দক্ষতার মান পূরণ করছেন—যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য একটি গভীর সংকেত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষকদের দক্ষতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে দুটি মৌলিক বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে—প্রথমত, সংশ্লিষ্ট স্তরে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ আছে কিনা এবং দ্বিতীয়ত, শিক্ষাগত যোগ্যতা ওই স্তরের উপযোগী কিনা। এই দুই মানদণ্ডে বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার চিত্র অত্যন্ত দুর্বল। নিম্ন মাধ্যমিকে দক্ষ শিক্ষকের হার ৫৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং উচ্চ মাধ্যমিকে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ—যা প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই এমন শিক্ষকের হাতে পড়ছে যাঁরা মানদণ্ড অনুযায়ী পুরোপুরি দক্ষ নন।
এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয় দক্ষিণ এশিয়ার তুলনামূলক অবস্থানে। মালদ্বীপ যেখানে ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ দক্ষ শিক্ষকের মাধ্যমে শীর্ষে অবস্থান করছে, সেখানে ভুটান, নেপাল, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ শুধু বৈশ্বিক নয়, আঞ্চলিক মানদণ্ডেও বাংলাদেশ একটি উদ্বেগজনক অবস্থানে রয়েছে।
এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BANBEIS) ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণে। সেখানে দেখা যায়, মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি পড়ানো শিক্ষকদের মধ্যে মাত্র ১৬ দশমিক ৯৯ শতাংশের রয়েছে ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। গণিতের ক্ষেত্রে এই হার ১৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ, যেসব বিষয় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতার ভিত্তি তৈরি করে, সেসব বিষয়েই বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি।
এই পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে—বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা কি সত্যিই গুণগত মানের দিকে এগোচ্ছে, নাকি কেবল পরিসংখ্যানগত সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ থাকছে?
শিক্ষক সংকট বা দক্ষতার ঘাটতি নতুন কোনো সমস্যা নয়, তবে এর স্থায়ী সমাধানের পরিবর্তে বছরের পর বছর এটি উপেক্ষিত থেকেছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মানদণ্ড শিথিলতা, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, এবং পেশাগত উন্নয়নের সীমিত সুযোগ—সব মিলিয়ে একটি কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষক নিয়োগকে সংখ্যা পূরণের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে, গুণগত মানের জায়গায় আপস করা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার দুর্বলতা। নিয়োগের পর যে ইন-সার্ভিস ট্রেনিং বা পেশাগত উন্নয়ন কার্যক্রম থাকা উচিত, তা অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথভাবে কার্যকর নয়। ফলে শিক্ষকরা দীর্ঘ সময় একই দক্ষতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে শ্রেণিকক্ষে থাকছেন, যা সরাসরি শিক্ষার্থীদের শেখার মানকে প্রভাবিত করছে।
এই সংকটের প্রভাব কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে। দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের মূল ভিত্তি হলো গুণগত শিক্ষা, আর সেই শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু হলো দক্ষ শিক্ষক। সেই ভিত্তি দুর্বল হলে পুরো কাঠামোই ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বর্তমান বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে—শিক্ষা খাতে নীতিনির্ধারণ কি পর্যাপ্ত তথ্যভিত্তিক এবং ভবিষ্যতমুখী? নাকি এটি এখনো স্বল্পমেয়াদি সমাধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ? কারণ আন্তর্জাতিক সূচকগুলো স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা ভর্তি হার বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, শিক্ষক নিয়োগে কঠোর বিষয়ভিত্তিক মানদণ্ড প্রণয়ন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যা বাস্তব শ্রেণিকক্ষভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে সহায়ক হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক পেশাকে আরও আকর্ষণীয় ও মর্যাদাপূর্ণ করার জন্য প্রণোদনা ও ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। চতুর্থত, শিক্ষা ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা ও মূল্যায়ন কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, দক্ষ শিক্ষকের সংকট কেবল একটি প্রশাসনিক সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় উন্নয়ন প্রশ্ন। যে দেশ তার শিক্ষককে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়, সে দেশ তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারে না।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—এখানে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি কেবল শিক্ষার পরিসংখ্যান বাড়াবো, নাকি সত্যিকারের মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে এগোবো। কারণ শেষ পর্যন্ত একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে তার শ্রেণিকক্ষের মান, এবং সেই মানের কেন্দ্রে থাকেন একজন শিক্ষক।

নিউজটি শেয়ার করুন..

Comments are closed.

পুরোনো খবর এখানে,তারিখ অনুযায়ী

© All rights reserved © 2024 dainikkushtia.net
Maintenance By DainikKushtia.net